৭ নভেম্বর অভ্যুত্থান-বিপ্লব না প্রতিবিপ্লব

৭ নভেম্বর অভ্যুত্থান-বিপ্লব না প্রতিবিপ্লব

ড. মো. আনোয়ার হোসেন

 

বাংলাদেশের ইতিহাসে ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরে অনুষ্ঠিত সিপাহী অভ্যুত্থান নানাভাবে বিতর্কিত। এই অভ্যুত্থানের রূপকার ও নেতা হিসেবে কর্নেল তাহের এর ভূমিকার কথা এখন অনেকেই স্বীকার করে নিয়েছেন। অভ্যুত্থানে সহায়তাকারী রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের ভূমিকাও স্বীকৃত। এই দল ও এর সমর্থক সংগঠনসমূহ নভেম্বর অভ্যুত্থানকে মুক্তিযুদ্ধের ধারাবাহিকতায় একটি উন্নততর সমাজ ব্যবস্থার উত্তরণের বিপ্ল¬বী প্রচেষ্টা হিসেবে গণ্য করে এবং ঐ দিনটিকে সিপাহী-জনতার অভ্যুত্থান দিবস হিসেবে পালন করে থাকে। কাছাকাছি মূল্যায়ন অর্থাৎ সিপাহী অভ্যুত্থানের বিপ্ল¬বী মর্মবস্তুর স্বীকৃতি দেয় বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি এবং দেশের অল্পকিছু সংখ্যক বাম বুদ্ধিজীবী।
অন্যদিকে সিপাহী অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতায় বসে জেনারেল জিয়াউর রহমানের সৃষ্টি করা বিএনপি ৭ নভেম্বরকে ‘জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস’ নামে পালন করে থাকে। ক্ষমতায় থাকাকালে ৭ নভেম্বরকে সরকারি ছুটির দিন ঘোষণা করে বিএনপি রাষ্ট্রীয় নানা অনুষ্ঠানাদির মাধ্যমে অভ্যুত্থানের নায়ক হিসেবে দলীয় নেতা জিয়ার নাম প্রচার করে এসেছে। এই দলের বক্তব্য অনুযায়ী ‘সিপাহী-জনতার বিপ্ল¬বের’ মাধ্যমে বাংলাদেশ সত্যিকারভাবে ‘আজাদী’ লাভ করেছে এবং তা সম্ভব হয়েছে ‘ভারতীয় তাঁবেদার রাজনৈতিক শক্তি’-কে পরাজিত করে। একই ধরনের বক্তব্য এরশাদ ও তাঁর দল জাতীয় পার্টির, জামায়াতসহ বিভিন্ন সাম্প্রদায়িক ও দক্ষিণপন্থী দলের এবং এমনকি বাম হিসেবে পরিচিত ছোটখাট দল, গোষ্ঠী ও ব্যক্তির। বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের সমর্থক হিসেবে গড়ে ওঠা বুদ্ধিজীবী মহল যাতে শামিল হয়েছে গোঁড়া ডান-বাম ও সাম্প্রদায়িক চিন্তার অনুসারীরা-তারাও নভেম্বর অভ্যুত্থানকে বিএনপি’র মূল্যায়নে বিচার করে থাকে।
আওয়ামী লীগ ও মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষ শক্তি হিসেবে পরিচিত রাজনৈতিক দল যেমন ন্যাপ, গণতন্ত্রী দল ও বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি এবং সাধারণভাবে আওয়ামী বুদ্ধিজীবী হিসেবে পরিচিত ব্যক্তিবর্গ ৭ নভেম্বর অভ্যুত্থানকে বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি চরম ক্ষতিকর ও নেতিবাচক ঘটনা হিসেবে চিত্রিত করে আসছেন। এদের অনেকেই ৩ নভেম্বরের খালেদ মোশাররফের অভ্যুত্থানকে দেখেন জিয়াউর রহমানের ক্ষমতারোহণ, দীর্ঘ দুই দশকের সামরিক স্বৈরতন্ত্র এবং সরকার ও রাষ্ট্র প্রশাসনের সকল স্তরে মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তির পুনর্বাসনের সঙ্গে সমার্থক করে। ’৯৬-এর নির্বাচন মারফত ক্ষমতায় এসে আওয়ামী লীগ সরকার তাই ৭ নভেম্বর সরকারি ছুটি বাতিল করেছে এবং ঐ ঘটনার পক্ষে রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানাদি বন্ধ করে দিয়েছে।
ভারত উপমহাদেশে সিপাহী বিদ্রোহ বা অভ্যুত্থানের ঘটনা এর আগেও ঘটেছে। পরাধীন ভারতে ১৮৫৭ সালে বৃটিশ বাহিনীর ভারতীয় সিপাহীরা বিদ্রোহে শামিল হয়েছিল শাসক ইংরেজদের বিরুদ্ধে। সে বিদ্রোহ পরাজিত হয় এবং হাজার হাজার সিপাহীকে জীবন দিতে হয় প্রকাশ্যে ফাঁসির দড়িতে। এরপর ১৯৭১ সালে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বাঙালি সৈনিকেরা বিদ্রোহ করে স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিল। মুক্তিযুদ্ধে জয়ী হওয়ায় বিদ্রোহী সৈনিকদের বিচারের সম্মুখীন হতে হয়নি। উপরোক্ত দুইটি সেনা বিদ্রোহের লক্ষ্য ছিল পরাধীনতার শৃঙ্খল ভেঙে স্বাধীনতা অর্জন।
কিন্তু স্বাধীন বাংলাদেশে সিপাহী অভ্যুত্থান ঘটলো কেন? সেনা বিদ্রোহ বা অভ্যুত্থানে শামিল হলে যেখানে মৃত্যুদ-ের মত চূড়ান্ত শাস্তি হবে তা জেনেও কেন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সাধারণ সৈনিকেরা ৭ নভেম্বরে এমন মরিয়া লড়াইয়ে ঝাঁপিয়ে পড়লো। এই প্রশ্নের উত্তর পেলে বক্ষমান নিবন্ধের শিরোনামের ব্যাপারে একটি সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া সহজতর হবে।
অভ্যুত্থানের আশু কারণ ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু হত্যা পরবর্তী সময়ে খুঁজে পাওয়া যাবে। কিন্তু তার সুদূর প্রসারী কারণ মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী বাংলাদেশে সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিশেষ করে রাষ্ট্র প্রশাসনে নানা অসঙ্গতির মধ্যে নিহিত।
পাকিস্তান সেনাবাহিনী থেকে বিদ্রোহ করে বাঙালি সিপাহীরা মুক্তিযুদ্ধ করেছে পুনরায় পাকিস্তান সেনাবাহিনীর মতো একটি বাহিনীর সদস্য হওয়ার জন্যে নয়। মুক্তিযুদ্ধ প্রচলিত যুদ্ধ নয়। এটা জনযুদ্ধ। জনগণের সাথে সম্পৃক্ত হয়ে মুক্তিযুদ্ধ করার ফলে বিদ্রোহী বাঙালি সৈনিকদের চিন্তায় মৌলিক পরিবর্তন সূচিত হয়। তাই স্বাধীন বাংলাদেশে একটি ঔপনিবেশিক আমলের আমলাতান্ত্রিক সেনাবাহিনীর স্থলে জনগণের স্বার্থরক্ষাকারী একটি গণবাহিনীর সদস্য হওয়ার স্বপ্ন দেখেছে তারা। বাস্তবে তা ঘটেনি। বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পর মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও লক্ষ্য অনুযায়ী বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর জন্য কল্যাণকর একটি গণতান্ত্রিক ও প্রগতিশীল সমাজের উপযোগী রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তোলার কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। তা করার জন্য প্রথমেই প্রয়োজন ছিল ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আইন-কানুনের ভিত্তিতে গড়ে তোলা পাকিস্তান রাষ্ট্র কাঠামোটিকে তার ভিতসহ উপড়ে ফেলা। তারপরই কেবল নতুন বাংলাদেশ রাষ্ট্র কাঠামোর সৌধটি গড়ে তোলা সম্ভব হতো। পৃথিবীর নানা দেশে যেখানে মুক্তিযুদ্ধ সংঘটিত হয়েছে এবং তার সুফল নিপীড়িত জনগণ পেয়েছে সেখানে পুরোনো ও অকেজো রাষ্ট্র কাঠামো ভেঙে ফেলে তার স্থলে নতুন কাঠামো অর্থাৎ জনপ্রশাসন, গণবাহিনী এবং নতুন বিচার ব্যবস্থা দৃঢ়ভাবে গড়ে তুলেই তা সম্ভব হয়েছে। এইসব ব্যবস্থা গ্রহণের মধ্যদিয়েই মুক্তিযুদ্ধের শক্তি তাদের ক্ষমতার ভিতকে শক্ত করেছে এবং পরাজিত শক্তির পুনরায় ক্ষমতা লাভের সম্ভাবনাকে কার্যকরভাবে বন্ধ করেছে।
অন্যদিকে মুক্তিযুদ্ধের মধ্যদিয়ে বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটলেও রাষ্ট্র ও সমাজ কাঠামোর কোনো ক্ষেত্রে উল্লি¬খিত কোনো পদক্ষেপ নেয়া হয়নি। এ সম্পর্কে ৭ নভেম্বর সিপাহী অভ্যুথানের নেতা কর্নেল তাহেরের একটি পর্যবেক্ষণ প্রণিধাযোগ্য। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে কাক্সিক্ষত পরিবর্তন না হওয়ার প্রতিবাদ হিসেবে ১৯৭২ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ঐ বাহিনী থেকে পদত্যাগের পর তাঁর লেখা ‘মুক্তিযোদ্ধারা আবার জয়ী হবে’ প্রবন্ধে তাহের উল্লে¬খ করেন, “বাংলার দুর্ভাগ্য, আইনানুগ উত্তরাধিকারীর সর্বস্তরের নেতৃত্ব এসেছে তাদেরই হাতে যারা পাক বিপ্ল¬ব যুগে ছিল ক্ষমতার উৎস। প্রশাসনযন্ত্র সেই পুরোনো ব্যক্তিরাই চালান। বাণিজ্য, শিক্ষা, সংস্কৃতির ক্ষেত্রেও তারাই। যে সামরিক অফিসার পকিস্তানি সৈন্যদের সঙ্গে দাঁড়িয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের নির্মূল করার জন্য ছিলেন সচেষ্ট, তিনি আজ আরও উচ্চ পদে সমাসীন (১৯৭৬ সালে গোপন বিচারে তাহেরকে মৃত্যুদ-ে দ-িত করেছিলেন এমনই একজন অফিসার, ব্রিগেডিয়ার ইউসুফ হায়দার)। যে পুলিশ অফিসার দেশপ্রেমিক মুক্তিযোদ্ধাদের ধরে সোপর্দ করেছে পাকিস্তানিদের হাতে তিনি আবার মুক্তিযোদ্ধাদের নামে হুলিয়া বের করতে ব্যস্ত। যে আমলারা রাতদিন খেটে তৈরি করেছে রাজাকার বাহিনী তারা মুক্তিযোদ্ধদেরকে চাকরি দিয়ে দয়া প্রদর্শনের অধিকারী। যে শিক্ষক দেশের ডাকে সাড়া দিতে পরেননি তিনিই আজ তরুণদের শিক্ষা দেয়ার দায়িত্ব পেয়েছে। পরিকল্পনা বিভাগের যে কর্মীকে শোষণের পরিকল্পনা করা শেখানো হয়েছে বছরের পর বছর ধরে তিনিই এখন সমাজতন্ত্রে উত্তরণের পরিকল্পনা তৈরি করেন। যুদ্ধ চলাকালে যারা পাকিস্তানিদের হয়ে প্রচারণায় মত্ত ছিলেন, ১৬ ডিসেম্বরের পর তারাই ভোল পাল্টিয়ে সংস্কৃতির মধ্যমণি হয়েছেন। অথচ মুক্তিযুদ্ধের পর প্রত্যেক দেশে করা হয়েছে কনসেনট্রেশন ক্যাম্প। মুক্তিযুদ্ধে যারা বিরোধীতা করেছে তারা স্থান পেয়েছে সেই ক্যাম্পে। সেখানে কায়িক পরিশ্রমের মাধ্যমে তাদেরকে আত্মশুদ্ধির সুযোগ দেওয়া হয়েছে। যাতে তারা বিপ্ল¬বী জনতার অংশ হতে পারে। নিতান্তই পরিতাপের বিষয়, যাদের কনসেনট্রশন ক্যাম্প থেকে আত্মশুদ্ধি করার কথা সকলের অগচরে তারা সর্বস্তরে নেতৃত্বের আসন দখল করে বসেছে।
….এরা বিশ্বঘাতক, দেশদ্রোহী, ক্ষমার অযোগ্য। এরা বাংলার সরল জনগণের মাথার বোঝা। এই বোঝাকে ঝেড়ে ফেলতে হবে। নির্মূল করতে হবে এদেরকে যাতে বাংলাদেশে আর বিশ্বাসঘাতকতার পুনরাবৃত্তি না হয়।”
তাহেরÑবর্ণিত এই বোঝাকে ফেলা যায়নি বলেই ১৫ আগস্ট হত্যাকা-ের মধ্যদিয়ে তারা রাষ্ট্রের সর্বময় ক্ষমতা দখল করতে পেরেছিল। তাহেরের মতো একই চিন্তা ছিল সিপাহী-ছাত্র-কৃষক-শ্রমিক-কর্মচারিসহ ব্যাপক জনগণের যারা মুক্তিযুদ্ধে শামিল হয়ে ছিলেন।
সিপাহী অভ্যুথানকে সেনাবাহিনীতে শ্রেণীসংগ্রাম এবং তার মধ্যদিয়ে একটি শ্রেণীহীন সেনাবাহিনী গড়ে তোলার প্রচেষ্টা হিসেবে উল্লেখ করেন। অতি সরলকৃত বক্তব্য হলেও অভ্যুথানকারী সৈনিকদের চেতনায় নিপীড়িত মানুষের শৃঙ্খলমুক্তির প্রবল ইচ্ছার বহিঃপ্রকাশ দেখা যায়। যেমনটা দেখা গেছে রোমের অভিজাততন্ত্রের বিরুদ্ধে দাস বিদ্রোহে অথবা বাংলায় জমিদারতন্ত্র ও ইংরেজ নিপীড়নের বিরুদ্ধে বিভিন্ন কৃষক-প্রজা বিদ্রোহে।
অভ্যুত্থানের আশু কারণ ও প্রেক্ষাপট কী ছিল? ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্ট বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে হত্যা করে রাষ্ট্রক্ষমতা থেকে আওয়ামী লীগ সরকারকে উচ্ছেদ করে মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তি। ক্ষমতার শক্তিবলয়ে গভীর শূন্যতার সৃষ্টি হয়। উন্মুক্ত রাজনীতির অনুপস্থিতি পরিস্থিতিকে জটিল করে তোলে। রাষ্ট্রের বিভিন্ন শক্তিকেন্দ্রগুলো দুর্বল হয়ে পড়ে। প্রতিরক্ষা বাহিনী ক্ষমতা পরিবর্তনের প্রধান নিয়ামক হয়ে পড়ে। ক্ষমতার শক্তিকেন্দ্র হয়ে পড়ে ক্যান্টনমেন্ট। তাই প্রাসাদ ষড়যন্ত্র চলতে থাকে সেখানে। ঊর্ধ্বতন সেনা অফিসাররা ক্ষমতা লাভের প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হন। এ কাজে সৈনিকদের ভাড়াটিয়া বাহিনীর সদস্য হিসেবে ব্যবহার করা হয়। এক ইউনিটকে দাঁড় করানো হয় অন্যের বিরুদ্ধে।
এমনি অবস্থায় ৩ নভেম্বর ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে পুনরায় ক্যুদেতা ঘটে। সেনাপ্রধান জিয়াকে বন্দী করে নতুন সেনাপ্রধান হন তিনি। সেনাবাহিনীতে চেইন অব কমান্ড ফিরিয়ে আনার লক্ষ্য ঘোষণা করে অভ্যুত্থান ঘটালেও সাধারণ সৈনিকদের চোখে তা নিছক ক্ষমতা দখলের প্রতিযোগিতা ছাড়া আর কিছুই মনে হয়নি। একই সময়ে ঢাকা কারাভ্যন্তরে মোশতাক চক্রের খুনি ঘাতক দল হত্যা করেছে জাতীয় চার নেতাকে। আর মোশতাক ও ঐ ঘাতকদের সঙ্গে দরবারে সময় ব্যয় করছেন খালেদ মোশাররফ। দেশে ২ নভেম্বর রাত থেকে ৫ নভেম্বর পর্যন্ত কোনো সরকার নেই। শ্বাসরুদ্ধকর ভীতিজনক এক অনিশ্চিত অবস্থার ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে দেশবাসী। যুদ্ধমান শক্তি সৈনিকদের অস্ত্র হাতে মুখোমুখি এমন লড়াইয়ে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে, যে-লড়াইয়ে সৈনিকদের কোনো স্বার্থ নেই। এই অচলাবস্থা থেকে পরিত্রাণের কোনো পথও কেউ দেখাতে পারছে না। এমনি অবস্থায় কর্নেল তাহেরের নেতৃত্বে বাংলাদেশে সংঘটিত হয় সিপাহী অভ্যুত্থান।
অস্ত্রহাতে হাজার হাজার সিপাহী ঢাকার রাস্তায় নেমে আসে। সিপাহী জনতা ভাই ভাই স্লে¬াগান দিয়ে তারা জনতার সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে। এই অভ্যুত্থানের সনদ সিপাহীদের ১২ দফা দাবির প্রথম দফাটি ছিল নি¤œরূপ: “আমাদের বিপ্ল¬ব নেতা বদলের জন্য নয়। এই বিপ্ল¬ব গরিব শ্রেণীর স্বার্থের জন্য। এতদিন আমরা ছিলাম ধনীদের বাহিনী। ধনীরা তাদের স্বার্থে আমাদের ব্যবহার করেছে। ১৫ আগস্ট তার প্রমাণ। তাই এবার আমরা ধনীদের দ্বারা ধনীদের স্বার্থে অভ্যুত্থান করিনি। আমরা বিপ্লব করেছি। আমরা জনগণের সাথে একত্র হয়েই বিপ্লবে নেমেছি। আমরা জনতার সঙ্গে থাকতে চাই। আজ থেকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী হবে গরিব শ্রেণীর স্বার্থ রক্ষার একটি গণবাহিনী।” অন্যান্য দাবির মধ্যে ছিল রাজবন্দিদের মুক্তি, রাজনৈতিক নেতাদের সাথে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ, অফিসার ও জোয়ানদের ভেদাভেদ দূর করা, ব্যাটম্যান প্রথার অবসান, অফিসারদের পৃথক রিক্রুটমেন্ট প্রথার অবসান, ব্রিটিশ আমলের আইনকানুন বদল, দুর্নীতিবাজদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত ইত্যাদি।
প্রেক্ষাপট, সুদূর ও আশু কারণ এবং ঘোষিত লক্ষ্য অনুযায়ী বিশেষ করে ১২ দফা দাবির প্রথম দফা অনুযায়ী সিপাহী অভ্যুত্থানকে তাই একটি বিপ্লব প্রচেষ্টা হিসেবে গণ্য করতে দ্বিধা থাকার কথা নয়। কিন্তু অভ্যুত্থানের ফলাফলের বিচারে তাকে প্রতিবিপ্ল¬ব আখ্যায়িত করতেও দ্বিধা হওয়ার কথা নয়।
তাহেরের নেতৃত্বে সিপাহী অভ্যুত্থান বাংলাদেশের রাজনীতিতে নিঃসন্দেহে একটি বিপ্লবী ঘটনা আর জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে পরিচালিত হয় প্রতিবিপ্লব। সিপাহীদের দাবির প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করে তাদের পক্ষ ত্যাগ করে হাত মিলিয়েছিলেন মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তির সঙ্গে। অভ্যুত্থানকারী সিপাহী ও তাদের নেতা তাহের পরাজিত হয়েছিলেন। কিন্তু তারা যে বিপ্ল¬বী ছিলেন তা বোঝা যায় জয়ী প্রতিবিপ্লবীদের হাতে তাদের জীবন দানের ঘটনা থেকে।
৭ নভেম্বরের সিপাহী অভ্যুত্থানের বিপ্লবী প্রচেষ্টা পরাজিত হওয়ায় সমাজের যে সমস্ত অসঙ্গতির কারণে তা ঘটেছিল তা দূর হয়নি। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ধারক সকল শক্তি এই তাৎপর্যপূর্ণ অভ্যুত্থানের ইতিবাচক শিক্ষা গ্রহণ করে ঐ সব অসঙ্গতি দূরীকরণে সচেষ্ট না হলে মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তি পুনরায় ক্ষমতায় আসীন হওয়ার সুযোগ করে নেবে। আমরা তা চাইতে পারি না।

 

ড. মো. আনোয়ার হোসেন: মুক্তিযোদ্ধা, বিজ্ঞানী, অধ্যাপক প্রাণ রসায়ন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।