english version Bangla Font Help
icon icon

জীবনপঞ্জী

কর্নেল আবু তাহের-এর সংক্ষিপ্ত জীবনপঞ্জি

মামলাসহ যাবতীয় ঘটনাবলি

১৪ নভেম্বর, ১৯৩৮:

আসামের বদরপুর ষ্টেশনে নানার বাসায় জন্ম। পিতা-মহিউদ্দিন আহমেদ, মাতা-আশরাফুন্নেসা। পৈত্রিক নিবাস-নেত্রকোণা জেলার পূর্বধলা উপজেলার কাজলা গ্রাম।

১৯৫২ সাল:

ট্রেনে ভ্রমণরত পূর্ব বাংলার মুখ্যমন্ত্রী নূরুল আমিনের কামরায় ভাষা আন্দোলনের কিশোরকর্মী তাহেরের নেতৃত্বে পাথর হামলা।

১৯৫২-১৯৫৪ সাল:

চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী ফতেহাবাদ স্কুলে অধ্যয়ন। ব্রিটিশ আমলে এ স্কুল ছিল বিপ্লবীদের অন্যতম কেন্দ্র।

১৯৫৫ সাল:

কুমিল্লার ইউসুফ হাইস্কুল থেকে মাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ।

১৯৫৭ সাল:

সিলেটের এম. সি. কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ। বিপ্লবী সাহিত্যের একনিষ্ঠ পাঠক।

১৯৫৯ সাল:

সিলেটের এম. সি. কলেজ থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন। চট্টগ্রামের মিরেশ্বরাই উপজেলার দূর্গাপুর উচ্চ বিদ্যালয়ে কিছুদিনের জন্য শিক্ষকতা। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের বিপ্লবীদের সাহচর্য লাভ।

১৯৬০ সাল:

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটে এম. এ. প্রথম পর্বে অধ্যয়ন। স্বাধীনতা যুদ্ধের জন্য প্রয়োজনীয় সামরিক ব্যুৎপত্তি অর্জনের লক্ষ্যে সেনাবাহিনীতে যোগদান। পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে বালুচ রেজিমেন্টে কমিশন লাভ।

১৯৬৫ সাল:

পাক-ভারত যুদ্ধে কাশ্মীর ও শিয়ালকোট রণাঙ্গনে অংশগ্রহণ। যুদ্ধাহত। প্যারা কমান্ডো বাহিনী ‘স্পেশাল সার্ভিসেস গ্রুপ’-এ যোগদান।

১৯৬৯ সাল:

তাহের ক্যাপ্টেন থেকে মেজর পদে উন্নীত। ছুটিতে ঢাকা এসে ছোট ভাই আনোয়ার হোসেনের মাধ্যমে সিরাজ শিকদার প্রতিষ্ঠিত পূর্ব বাংলা শ্রমিক আন্দোলনের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন। ঢাকার কলাবাগানে সংগঠনের কর্মীদের সশস্ত্র স্বাধীনতা সংগ্রাম সংগঠিত করার জন্য তাহেরের প্রশিক্ষণ প্রদান। কিছুদিন পরেই মতবিরোধ ও সম্পর্কচ্ছেদ। সামরিক শাসনবিরোধী গণঅভ্যুত্থান চলাকালে ছাত্রলীগের কর্মীদের ও নিজ ভাইদের গেরিলাযুদ্ধ ও বিস্ফোরক ব্যবহারের প্রশিক্ষণ প্রদান। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ এর আগে এঁরাই ঢাকায় রাজনৈতিক কর্মীদের কয়েক হাজার মলোটভ ককটেল ও হ্যান্ড গ্রেনেড সরবরাহ করেন। স্পেশাল এলিট কমান্ডো গ্রুপের কমান্ডার নিযুক্ত।

৭ আগষ্ট, ১৯৬৯:

কিশোরগঞ্জের জঙ্গলবাড়ি নিবাসী ডা. খুরশীদ উদ্দিন আহমেদের কন্যা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণ রসায়ন বিভাগের মাস্টার্স প্রথম পর্বের ছাত্রী লুৎফার সঙ্গে বিয়ে। বছরের শেষদিকে পশ্চিম পাকিস্তানের আটক ফোর্টে বদলি।

জানুয়ারি, ১৯৭০:

প্যারা কমান্ডো হিসেবে ১৩৫টি স্ট্যাটিক লাইন প্যারা জাম্প করার কৃতিত্বের অধিকারী। বাঙ্গালিদের মধ্যে একমাত্র তিনিই ‘মেরুন প্যারাসুট উইং’ পান। কৃতিত্বের স্বীকৃতিস্বরূপ উচ্চতর সামরিক প্রশিক্ষণের জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র গমন। জর্জিয়ার ফোর্ট বেনিং-স্থিত রেঞ্জার ট্রেনিং ইনস্টিটিউট থেকে রেঞ্জার সনদে ভূষিত। নর্থ ক্যারোলিনার ফোর্ট ব্রাগ-স্থিত স্পেশাল ফোর্সেস অফিসার্স ট্রেনিং ইনস্টিটিউট থেকে সম্মানসহ স্নাতক ডিগ্রি অর্জন। ‘পৃথিবীর যেকোনো সামরিক বাহিনীর সঙ্গে যেকোনো অবস্থায় কাজ করতে সক্ষম হিসেবে স্বীকৃত’। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে ব্রিটেন গমন। সেখান থেকে পশ্চিম পাকিস্থানের আটক ফোর্টে প্রত্যাবর্তন।

২৫ মার্চ, ১৯৭১:

পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী কর্তৃক বাঙ্গালিদের ওপর পরিকল্পিত গণহত্যা শুরু।

২৬ মার্চ, ১৯৭১:

বঙ্গবন্ধু কর্তৃক বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা। কোয়েটা অফিসার্স ক্লাবে সন্ধ্যায় জনৈক পাঞ্জাবি সেনা কর্মকর্তার মন্তব্য: ‘Mujib is a traitor’। তাহের তার জামার কলার চেপে ধরেন ও তাৎক্ষণিকভাবে বক্তব্য প্রত্যাহার করতে বলেন, অন্যথায় তাকে হত্যা করার হুমকি দেন। তাহেরের দৃঢ়তায় ভীত হয়ে ওই কর্মকর্তা তার মন্তব্য প্রত্যাহার করেন।

৩০ মার্চ, ১৯৭১:

কোয়েটা ইনফ্যান্ট্রি স্কুলে তাহেরের সিনিয়র ট্যাকটিক্যাল কোর্স অসমাপ্ত অবস্থায় শেষ করে দেয়া হয়।

১ এপ্রিল, ১৯৭১:

সরকারি নীতি ও সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে বিরূপ মন্তব্য করা এবং ২৬ মার্চ পাকিস্থানি সামরিক কর্মকর্তাকে হত্যার হুমকি দেওয়ার অভিযোগে কোয়েটা ছেড়ে নিজ ইউনিটে না যাওয়ার নির্দেশ। নজরবন্দি।

৭ এপ্রিল, ১৯৭১:

বিমানে করে তাহেরকে কোয়েটা থেকে খারিয়া সেনানিবাসে প্রেরণ। বিমানটি ছিনতাইয়ের পরিকল্পনা ব্যর্থ।

৮-২৮ এপ্রিল, ১৯৭১:

ক্যাপ্টেন দেলোয়ার ও ক্যাপ্টেন পাটোয়ারীকে নিয়ে পালানোর পরিকল্পনা। শেষ দিকে তাঁকে খারিয়া থেকে অ্যাবোটাবাদে বেলুচ রেজিমেন্টাল সেন্টারে বদলি করা হয়।

২৯ এপ্রিল, ১৯৭১:

পাকিস্তান থেকে পালানোর চেষ্টা। মিরপুর শহরের কাছে সামরিক সাপ্লাই ইউনিটের কাছের দুর্গম পথ থেকে ফিরে আসেন।

২৫ জুলাই, ১৯৭১:

মেজর জিয়াউদ্দিন ও ক্যাপ্টেন পাটোয়ারীকে নিয়ে শিয়ালকোটে মেজর মঞ্জুরের বাড়িতে। রাত পৌনে নটায় স্ত্রী-সন্তান ও ব্যাটম্যান আলমগীরসহ শিয়ালকোট-জাফরওয়ালের পথে নেমে ভারতীয় সীমান্ত ঘাঁটি দেবীগড়ে পৌঁছেন।

২৭ জুলাই, ১৯৭১:

সীমান্ত ঘাঁটি দেবীগড় থেকে দিল্লি পৌঁছেন।

আগস্ট, ১৯৭১:

মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের জন্য প্রথম সপ্তাহেই বাংলাদেশ সরকারের অস্থায়ী রাজধানী মুজিবনগর পৌঁছেন। দ্বিতীয় সপ্তাহে মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক কর্নেল ওসমানী কর্তৃক বিভিন্ন সেক্টরের যুদ্ধপরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ ও মতামত দানের জন্য প্রেরিত।

১২ আগষ্ট, ১৯৭১:

মেঘালয় সীমান্ত এলাকায় মুক্তিযোদ্ধাদের মাঝে তাহের।

১৫ অগাষ্ট, ১৯৭১:

কামালপুরের পাকিস্তানি ঘাঁটিতে তিনি তাঁর প্রথম সুসংগঠিত আক্রমণ পরিচালনা করেন। এ এলাকা কোনো সেক্টরের অধীনে না থাকায় এর সামরিক গুরুত্ব উপলব্ধি করে মুক্তিবাহিনীর সর্বাধিনায়ককে এ এলাকাকে সেক্টরে পরিণত করার প্রস্তাব রাখেন। সেভাবেই ১১নং সেক্টর গঠিত হয় বৃহত্তর ময়মনসিংহ ও রংপুরের অংশবিশেষ নিয়ে, কমান্ড পান তিনি নিজেই।

সেপ্টেম্বর, ১৯৭১:

প্রথম সপ্তাহে কোদালকাঠি দখল। ১১নং সেক্টরকে দুটি সাব-সেক্টরে বিভক্ত করেন, দায়িত্ব দেন স্কোয়াড্রন লিডার হামিদুল্লাহ ও লে. মান্নানকে। মাঝামাঝি সময়ে মেজর জিয়াউর রহমান তাঁর ব্রিগেড নিয়ে ১১নং সেক্টরের নিকটবর্তী তেলঢালা ত্যাগ করে সিলেট সীমান্তে চলে যান।

৭-১১ সেপ্টেম্বর, ১৯৭১:

ঢাকার প্রবেশদ্বার হিসেবে খ্যাত ঐতিহাসিক ‘কামালপুর অভিযান’।

অক্টোবর, ১৯৭১:

প্রথম সপ্তাহে আরও ৫ জন সামরিক কর্মকর্তা ১১নং সেক্টরে যোগ দেন, বিভিন্ন সাব-সেক্টরে তাঁদের দায়িত্ব বণ্টন করেন।

৭-১২ অক্টোবর, ১৯৭১:

বিশাল ব্রহ্মপুত্র নদ পাড়ি দিয়ে বিখ্যাত ‘চিলমারী রেইড’-এ প্রত্যক্ষ নেতৃত্ব দান। অভূতপূর্ব সাফল্যের সঙ্গে ১৩ তারিখ রৌমারী প্রত্যাবর্তন।

নভেম্বর, ১৯৭১:

১৭ হাজার গেরিলা বাহিনীর একাংশকে নিয়মিত বাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত করে একটি ব্রিগেড গঠনের অনুমতি প্রার্থনা করেন প্রথম সপ্তাহে। কর্নেল ওসমানী ও মুজিবনগর সরকার কর্তৃক প্রত্যাখ্যান।

১৪ নভেম্বর, ১৯৭১:

জন্মদিনে কামালপুর দখলের সম্মুখ সমরে গুরুতর আহত, বাম পা হাঁটুর ওপর থেকে বিচ্ছিন্ন।

১৬ ডিসেম্বর, ১৯৭১:

পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর ৯৩ হাজার সদস্যের আত্মসমর্পণ। ১১নং সেক্টরের মুক্তিযোদ্ধারাই সর্বপ্রথম ঢাকা প্রবেশ করেন। তাহেরের অবর্তমানে মুক্তিবাহিনীর পক্ষ থেকে তাঁর বড় ভাই আবু ইউসুফ বীর বিক্রম ১৬ ডিসেম্বর সকালে যৌথ বাহিনীর সেনা অধিনায়কদের সাথে পাকিস্তান বাহিনীর সর্বাধিনায়ক জেনারেল নিয়াজীর দপ্তরে আত্মসমর্পণ আলোচনায় যোগ দেন এবং বিজয়ের প্রতীক হিসেবে তাঁর স্টাফ কারের পতাকাটি উঠিয়ে নেন।

২৫ ডিসেম্বর, ১৯৭১:

গৌহাটি মিলিটারি হাসপাতাল থেকে লক্ষেèৗতে আরেকটি অপারেশনের জন্য গমন।

এপ্রিল, ১৯৭২:

পুনা আর্টিফিশিয়াল লিম্ব সেন্টার থেকে কৃত্রিম পা নিয়ে তাহেরের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রথম অ্যাডজুট্যান্ট জেনারেল নিযুক্ত।

জুন, ১৯৭২:

কতিপয় ঊর্ধতন সামরিক কর্মকর্তার দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করার উদ্যোগ। জেনারেল হেড কোয়ার্টার থেকে কুমিল্লায় ৪৪নং ব্রিগেডের কমান্ডার হিসেবে বদলি।

সেপ্টেম্বর, ১৯৭২:

কুমিল্লায় সেনাবাহিনীকে উৎপাদনশীল কর্মকা-ে নিয়োজিত করায় প্রত্যক্ষ কমান্ড থেকে সরিয়ে ডিডিপি (পরিচালক, প্রতিরক্ষা ক্রয়) পদে বদলি।

২২ সেপ্টেম্বর, ১৯৭২:

প্রতিবাদে বঙ্গবন্ধুকে ঐতিহাসিক পদত্যাগপত্র প্রেরণ। সেনাবাহিনী থেকে পদত্যাগ।

৩১ অক্টোবর, ১৯৭২:

জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ)-এর আত্মপ্রকাশ। পরবর্তীতে জাসদের পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠিত হলে তিনি অন্যতম সহ-সভাপতি নির্বাচিত।

জানুয়ারি, ১৯৭৩:

সেচ ও বন্যা নিয়ন্ত্রণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে নারায়ণগঞ্জে ড্রেজিং সংস্থায় পরিচালক পদে যোগদান।

জুন, ১৯৭৪:

বিপ্লবী পার্টি প্রক্রিয়ার খসড়া সংবিধান এবং বিপ্লবের স্তর চিহ্নিত করে রণনীতি ও রণকৌশল নির্ধারণে ‘খসড়া থিসিস’ প্রণয়নের জন্য জাসদ জাতীয় কমিটির বর্ধিত সভায় ৩২ সদস্যের সমন্বয় কমিটি গঠন। তাহের সমন্বয় কমিটির অন্যতম সদস্য ছিলেন। ২৭ জুন এ ‘খসড়া থিসিস’ প্রণীত ও প্রকাশিত হয়।

১৯৭৫ সাল:

বিপ্লবী পার্টি প্রক্রিয়ার সশস্ত্র সংগঠন ‘বিপ্লবী গণবাহিনী’ (Revolutionary People’s Army) গঠন। কেন্দ্রীয় কমান্ডসহ প্রত্যেক শাখা কমান্ডে একজন করে কমান্ডার ও একজন রাজনৈতিক কমিশনার নিয়োগ। কেন্দ্রীয় কমান্ডের সর্বাধিনায়ক হন কর্নেল আবু তাহের। উপ-সর্বাধিনায়ক হন হাসানুল হক ইনু। ঢাকা নগর গণবাহিনীর অধিনায়ক ছোট ভাই আনোয়ার হোসেন। গণবাহিনীর শাখা হিসেবে সশস্ত্র বাহিনীতে গঠিত হয় ‘বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা’।

১৫ আগষ্ট, ১৯৭৫:

বঙ্গবন্ধু মন্ত্রিসভার সদস্য খন্দকার মোশতাক আহমেদের নেতৃত্বে সামরিক ক্যুদেতা। বঙ্গবন্ধু পরিবার, শেখ ফজলুল হক মনির পরিবার, আব্দুর রব সেরনিয়াবাতের পরিবার ও অন্যান্য নৃশংসতম নৃশংসতম হত্যাকা-। খন্দকার মোশতাক রাষ্ট্রপতি, জিয়াউর রহমান সেনাপ্রধান, জেনারেল এম এ জি ওসমানী রাষ্ট্রপতির প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা।

৩ নভেম্বর, ১৯৭৫:

ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে পাল্টা সামরিক ক্যুদেতা। আগস্ট ক্যুদেতার সংগঠকদের দ্বারা ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে তাজউদ্দীন আহমদ, সৈয়দ নজরুল ইসলাম, মনসুর আলী ও কামরুজ্জামানকে নৃশংস হত্যাকা-। জিয়াকে গৃহবন্দি, জিয়া কর্তৃৃক টেলিফোনে তাহেরের কাছে প্রাণ রক্ষার জন্য ব্যবস্থা নেয়ার আবেদন। বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার সদস্যগণ তাহেরকে নারায়ণগঞ্জ থেকে সন্ধ্যায় ঢাকায় নিয়ে আসেন।

৪ নভেম্বর, ১৯৭৫:

জিয়া তার এক আত্মীয়ের মাধ্যমে বিকেলে আবার তাহেরের কাছে প্রাণ বাঁচাতে কিছু করার আবেদন জানান। ক্যু-পাল্টা ক্যু-জনিত অস্থিতিশীল পরিস্থিতি পর্যালোচনার জন্য তাহের বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার নেতৃত্বের সঙ্গে আলোচনায় বসেন। প্রাসাদ ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়ে সৈনিক সংস্থা একটি প্রচারপত্র তৈরি করে। কেন্দ্রীয় সমন্বয় কমিটির সবাই ঢাকায় না থাকায় জরুরি স্থায়ী কমিটি বসে ও পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে। বিপ্লবী গণবাহিনীর ঢাকা নগর শাখাকে প্রস্তুত করার নির্দেশ দেয়া হয়। আনোয়ার হোসেনের নেতৃত্বাধীন ঢাকা নগর গণবাহিনীর বিশেষ টিমকে সক্রিয় করা হয়।

৫ নভেম্বর, ১৯৭৫:

বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা তাহেরের সঙ্গে বৈঠকে বসে, নির্দেশনা নিয়ে আবার সেনানিবাসে যায়। জরুরি স্থায়ী কমিটি করণীয় নির্ধারণে বৈঠক অব্যাহত রাখে। ঢাকা সেনানিবাসের সর্বত্র সৈনিক সংস্থার প্রচারপত্র বিলি। ব্যাপক প্রতিক্রিয়া।

৬ নভেম্বর, ১৯৭৫:

প্রকৌশলী আনোয়ার সিদ্দিকীর গুলশানস্থ বাসভবনে বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা ও গণবাহিনীর প্রায় ৭০ জন প্রতিনিধির আলোচনায় সিপাহী গণঅভ্যুত্থানের প্রস্তাব করা হয়। রাতে বিপ্লবী পার্টি প্রক্রিয়ার জরুরি স্থায়ী কমিটি সিপাহী গণঅভ্যুত্থানের চূড়ান্ত অনুমোদন দেয়। ঢাকা নগরের গণবাহিনীর সকল শাখাকে সিপাহীদের সঙ্গে জনগণের সমন্বয় করার নির্দেশ দেয়া হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখাকে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে ছাত্র-জনতার সমাবেশ করার দায়িত্ব প্রদান করা হয়। স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে বিপ্লবী গণবাহিনী ঢাকা নগর শাখার বিশেষ টিমকে ভ্রাম্যমাণ প্রচার ও সমন্বয় করার দায়িত্ব দেয়া হয়।

৭ নভেম্বর, ১৯৭৫:

বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা ও বিপ্লবী গণবাহিনীর উদ্যোগে আবু তাহেরের নেতৃত্বে সিপাহী জনতার অভ্যুত্থান। শেষ রাতে বাংলাদেশ বেতারে বিপ্লবী গণবাহিনী ও সৈনিক সংস্থার নেতৃত্বে সিপাহী জনতার অভ্যুত্থানের ঘোষণা। জিয়াউর রহমান মুক্ত। কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে সিপাহী-ছাত্র-জনতার মিলনমেলা। সকাল ১১টায় খন্দকার মোশতাক-রশিদ-ফারুকের সমর্থক সৈন্যরা গুলিবর্ষণ করে শহীদ মিনারের সমাবেশ সাময়িকভাবে ছত্রভঙ্গ করে। ক্যান্টনমেন্টে জিয়া ও তার পারিষদদের সঙ্গে তাহের, ইনু, ড. আখলাখের বৈঠক। সকল গণতান্ত্রিক শক্তির সমন্বয়ে গণতান্ত্রিক জাতীয় সরকার গঠনের জন্য জাসদ ও গণবাহিনী নেতৃবৃন্দের প্রস্তাব পেশ। সন্ধ্যায় জিয়া কর্তৃক জাতির উদ্দেশে বেতার ভাষণ প্রদান। ভাষণের পূর্বে বেতার ভবনে বিপ্লবী সৈনিকদের প্রতি ধন্যবাদ জ্ঞাপন ও ১২ দফা আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রহণ ও তা মেনে নেয়ার প্রতিশ্রুতি।

৮ নভেম্বর, ১৯৭৫:

বিকেলে ঢাকা বায়তুল মোকাররমে জাসদের জনসভায় পুলিশ কর্তৃক প্রথমে বাধাদান, ফারুক-রশিদের ঘাতক দলের অর্তকিত গুলিবর্ষণে ছাত্রনেতা আ ফ ম মাহাবুবুল হক গুরুতর আহত, পরে বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার হস্তক্ষেপে জনসভা সম্পন্ন। ঢাকার বাইরের বিভিন্ন জেলা থেকে জাসদ সভাপতি মেজর (অব.) এম এ জলিল ও সাধারণ সম্পাদক আ স ম আবদুর রবের কারামুক্তি। সিপাহী গণঅভ্যুত্থানের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন নিয়ে জিয়ার সঙ্গে বৈঠকে বসার জন্য জাসদ ও গণবাহিনী নেতৃবৃন্দের প্রস্তাব। জিয়ার নীরবতা।

১২-২২ নভেম্বর, ১৯৭৫:

সিপাহী গণঅভ্যুত্থানের সঙ্গে জিয়ার বিশ্বাসঘাতকতা ক্রমান্বয়ে দৃশ্যমান হতে থাকে।

২৩ নভেম্বর, ১৯৭৫:

জাসদ নেতা মেজর (অব.) এম এ জলিল, আ স ম আবদুর রব, হাসানুল হক ইনু, আবু ইউসুফ খান বীর বিক্রম, কে বি এম মাহমুদসহ বেশ কয়েকজন নেতৃবৃন্দকে গ্রেফতার। জাসদের সঙ্গে আলোচনার দরজা বন্ধ করে দেন জিয়া।

২৪ নভেম্বর, ১৯৭৫:

ঢাকা বিশ্ববিদ্যায়ের সলিমুল্লাহ হলের হাউস টিউটরের বাসা থেকে আবু তাহের গ্রেফতার, সরাসরি ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে প্রেরণ। কিছুদিনের মধ্যেই দ্রুত রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারের নির্জন সেলে বন্দী।

২৬ নভেম্বর ১৯৭৫:

জলিল-রব-তাহের-ইনুসহ জাসদ-গণবাহিনী-সৈনিক নেতৃবৃন্দকে মুক্তির লক্ষ্যে বিপ্লবী গণবাহিনীর ঢাকা নগরীর বিশেষ টিম কর্তৃক ভারতীয় হাই কমিশনার সমর সেনকে অপহরণের চেষ্টা। সংগঠনের ঊর্ধ্বতন নেতৃত্বকে অবহিত না করে এ অভিযান চালানো হয়। অভিযান ব্যর্থ হয়, আসাদ-বাচ্চু-মাসুদ-হারুন শহীদ হন, বেলাল-সবুজ আহত অবস্থায় গ্রেফতার হন। তাহেরের ছোট ভাই শাখাওয়াত হোসেন বাহার বীরপ্রতীক (সাংগঠনিক নাম আসাদ) এই অভিযানে নেতৃত্ব দেন।

২২ মে, ১৯৭৬:

রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে হেলিকপ্টারে করে তাহেরকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে নিয়ে আসা হয়।

১৫ জুন, ১৯৭৬:

মুক্তিযুদ্ধবিরোধী সামরিক কর্মকর্তা কর্নেল ইউসুফ হায়দারকে চেয়ারম্যান করে ১নং বিশেষ সামরিক আইন আদালত গঠনের সরকারি ঘোষণা। তাহেরসহ ৩৩ জন অভিযুক্ত, এর মধ্যে ২২ জন সশস্ত্র বাহিনীর সদস্য। এ দিনই ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান কারাগারে তাহেরের সঙ্গে দেখা করেন। অর্থাৎ ১৫ তারিখ ঘোষণা দেয়া হলেও এ সামরিক আদালত আরও আগে থেকেই প্রস্তুত করা হচ্ছিল।

১৮ জুন, ১৯৭৬:

১নং বিশেষ সামরিক আইন আদালতের প্রথম অধিবেশন। ২৮ জুন পর্যন্ত মুলতবি।

২৮ জুন, ১৯৭৬:

সামরিক আদালতের দ্বিতীয় অধিবেশন শুরু। কারাগারে বিচারানুষ্ঠানের জন্য প্রবেশরত প্রধান অভিযোগকারী এ টি এম আফজাল, বিচারক কর্নেল ইউসুফ হায়দারসহ অন্যান্যদের ছবি তোলায় এনএসআই কর্তৃক মার্কিন সাংবাদিক লরেন্স লিফৎশুলজ এর ক্যামেরা ছিনিয়ে নিয়ে ফিল্ম নষ্ট করা ও তাঁকে আটক, তিন দিন গৃহবন্দি। অবশেষে দেশ থেকে বহিষ্কার।

২৮ জুন-৮ জুলাই, ১৯৭৬:

রাজসাক্ষী ও সরকারি সাক্ষীদের বক্তব্য প্রদান।

১১-১৪ জুলাই, ১৯৭৬:

অভিযুক্তদের জবানবন্দি প্রদান। ১২ জুলাই অনেক বাধা-বিপত্তির মাঝেও তাহের একটানা ৬ ঘণ্টা বক্তব্য রাখেন।

১৭ জুলাই, ১৯৭৬:

কর্নেল ইউসুফ হায়দার গোপন সামরিক আদালতের পক্ষে রায় ঘোষণা করেন, আবু তাহেরের মৃত্যুদ- ও অন্যান্য নেতৃবৃন্দকে দীর্ঘমেয়াদি কারাদ- প্রদান।

২১ জুলাই, ১৯৭৬:

ভোর চারটায় ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে ফাঁসির মঞ্চে কর্নেল আবু তাহের বীরউত্তম বীরোচিত আত্মদান করেন।

২২ জুলাই-১১ আগস্ট, ১৯৭৬:

পৈত্রিক বাড়ি কাজলা গ্রামে তাহেরের সমাধিতে সামরিক ছাউনি ফেলে সেনাবাহিনীর প্রহরা।

৩১ জুলাই, ১৯৭৬:

ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক অবৈধভাবে তাহেরের মৃত্যুদ-কে বৈধতা দানের জন্য আইন মন্ত্রণালয় তাহের হত্যার ১০ দিন পরে সামরিক আইনের ২০তম সংশোধনী জারি করে।

২৯ আগস্ট, ২০০৫:

হাইকোর্ট সংবিধানের ৫ম সংশোধনীকে অবৈধ ঘোষণা করেন।

২ ফেব্রুয়ারি, ২০১০:

হাইকোর্টের এই রায়ের বিরুদ্ধে বিএনপি ও জামায়াতের পক্ষ থেকে আপিল করা হলে সুপ্রিম কোর্ট তা খারিজ করেন।

২৩ আগস্ট, ২০১০:

ড. আনোয়ার হোসেন, লুৎফা তাহের ও ফাতেমা ইউসুফ-এর পক্ষে ড. শাহ্দীন মালিক কর্তৃক দায়ের করা এক রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বিচারপতি এ এইচ এম শামসুদ্দিন চৌধুরী ও বিচারপতি শেখ মো. জাকির হোসেন সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এক আদেশে কর্নেল আবু তাহের বীরউত্তমের ফাঁসি ও গোপন বিচারের সব নথি হাইকোর্টে তলব করেন। একই সঙ্গে তাহেরের ফাঁসির আদেশকে কেন অসাংবিধানিক ও অবৈধ ঘোষণা করা হবে নাÑতা তিন সপ্তাহের মধ্যে জানাতে সরকারকে নির্দেশ দেন।

২ ডিসেম্বর, ২০১০:

হাইকোর্ট বেঞ্চ কর্তৃক রিট শুনানি শুরুর সিদ্ধান্ত।

১৩ ডিসেম্বর, ২০১০:

সরকারের আবেদনে ৬ জানুয়ারি পর্যন্ত শুনানি মুলতবি।

১০ জানুয়ারি-২১ মার্চ, ২০১১:

দীর্ঘ শুনানি। হাসানুল হক ইনু, মেজর জিয়াউদ্দিন, মাহমুদুর রহমান মান্না, সার্জেন্ট রফিকুল ইসলাম বীরপ্রতীক, কর্পোরাল সামশুল হক, অ্যাডভোকেট রবিউল আলম, হাবিলদার আব্দুল হাই কর্তৃক বক্তব্য প্রদান। রিট আবেদনকারী ড. মো. আনোয়ার হোসেন কর্তৃক সম্পূরক রিট বক্তব্য প্রদান।
তাহেরের মৃত্যুদ- কার্যকরের সময় উপস্থিত সাবেক ম্যাজিস্ট্রেট ফজলুর রহমান আদালতকে জানান, ফাঁসির আগমুহূর্তে তাহেরের সর্বশেষ কথা ছিল ‘Long live my country men’। ঢাকার ডেপুটি কমিশনার মো. মজিবুল হককে আদালতে তলব।
‘পাকিস্থান ফেরত সেনা কর্মকর্তাদের চাপে জিয়া তাহেরকে সরিয়ে দেন’-ব্যারিস্টার মওদুদের লেখা বইয়ে উদ্ধৃত অংশের ব্যাখ্যা আদালত লেখকের কাছে জানতে চান।
যুক্তরাষ্ট্র থেকে ই-মেইলে পাঠানো বার্তায় জিয়ার ডানহাত হিসেবে পরিচিত জেনারের নূরুল ইসলাম শিশু আদালতকে জানান, তাহেরের গোপন বিচার পরিকল্পনা করেন জিয়া-সায়েম-সাত্তার।
লরেন্স লিফৎশুলজ আদালতে উপস্থিত হয়ে তাঁর দীর্ঘ জবানবন্দিতে জানান, ‘গোপন আদালতের বিচারে তাহেরের মৃত্যুদ- একটি হত্যাকা-। এর সঙ্গে জড়িত একজনের নাম বলতে হলে, তিনি হলেন জিয়াউর রহমান’।
অ্যামিকাস কিউরি হিসেবে আদালতে অভিমত দেন ড. কামাল হোসেন, ব্যারিস্টার এম আমির উল ইসলাম, ড. এম জহির, অ্যাডভোকেট এম আই ফারুকী, ব্যারিস্টার আখতার ইমাম, অ্যাডভোকেট ইউসুফ হোসেন হুমায়ুন, অ্যাডভোকেট আবদুল মতিন খসরু, অ্যাডভোকেট এ এফ এম মেজবাহ উদ্দিন এবং অ্যাডভোকেট জেড আই খান পান্না। ড. শাহ্দীন মালিক ও ব্যারিস্টার রোকনউদ্দিন মাহমুদ রিট আবেদনকারীদের পক্ষে এবং অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম, অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল অ্যাডভোকেট এম কে রহমান ও ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল এ বি এম আলতাফ হোসেন রাষ্ট্রপক্ষে মামলা পরিচালনা করেন।

২২ মার্চ, ২০১১:

‘তাহেরের বিচার অবৈধ’ এবং তাঁকে ‘ঠান্ডা মাথায় হত্যাকা-’ হিসেবে রায় দেন হাইকোর্ট বেঞ্চ। তাহেরকে শহীদ ও মহান দেশপ্রেমিক হিসেবে রায়ে উল্লেখ করা হয়। সহ-অভিযুক্তদের সকল সাজা মওকুফ করে তাঁদের যথাযোগ্য ক্ষতিপূরণ প্রদান করতে বলা হয় রাষ্ট্রকে। এ হত্যাকা-ের জন্য জেনারেল জিয়াকে দায়ী করেন আদালত। ট্রাইব্যুনালের একমাত্র জীবিত সদস্য আব্দুল আলীর বিরুদ্ধে হত্যা মামলা দায়ের করার জন্য সরকারের প্রতি নির্দেশ দেয়া হয়।

২০ মে, ২০১৩:

তাহের ও তাঁর সঙ্গীদের গোপন বিচার অবৈধ ও বেআইনি ঘোষণা করে হাইকোর্টের দেওয়া পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ। এতে তাহেরের মৃত্যুদ-কে ঠান্ডা মাথার খুন হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। রায়ে বলা হয়, কর্নেল তাহেরের মৃত্যুদ- হত্যাকা-। কারণ ট্রাইব্যুনাল গঠনের অনেক আগেই জেনারেল জিয়াউর রহমান তাহেরকে মৃত্যুদ- প্রদানে মনস্থির করেন। ওই হত্যাকা-কে বিচারবর্হিভূত হত্যাকা- হিসেবে চিত্রিত করতে সরকারের প্রতি নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট।

সর্বশেষ খবর ও ইভেন্ট

There are no upcoming events.

আরও খবর ও ইভেন্ট