english version Bangla Font Help
icon icon

তাহের ও জিয়া: বিপরীত স্রোতের যাত্রী

taherবিশেষ সামরিক আদালতে কর্নেলতাহেরের মৃত্যুদণ্ডের রায় চ্যালেঞ্জ করে রিটের পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্টের পূর্ণাঙ্গ রায়ের পর ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের ঘটনাটি ফের আলোচনায় এসেছে। কথাসাহিত্যিক শাহাদুজ্জামানের লেখায় এই ঘটনার প্রধান দুই কুশীলব আবু তাহের ও জিয়াউর রহমানের ভূমিকার ওপর আলো ফেলা হয়েছে।

গোপন বিচারে কর্নেল আবু তাহেরের ফাঁসিকে হত্যাকাণ্ড বলে অভিহিত করে হাইকোর্ট রায় দিয়েছেন এবং এই হত্যাকাণ্ডের পেছনে জেনারেল জিয়ার সংশ্লিষ্টতার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। স্মরণযোগ্য, ১৯৭৬-এ সেই গোপন বিচার সংঘটিত হওয়ার কিছু আগে দেশের জটিল রাজনৈতিক মুহূর্তে মৃত্যুর ঝুঁকিতে থাকা বন্দী জেনারেল জিয়াকে এই কর্নেল তাহেরই উদ্ধার করেছিলেন। বাংলাদেশের ইতিহাসের গতিপথ নির্ধারণে কর্নেল তাহের এবং জেনারেল জিয়ার পারস্পরিক সম্পর্কের ভূমিকাটি কৌতূহলোদ্দীপক। তাহের ও জিয়া উভয়ের পেশাগত যাত্রা শুরু সেনাবাহিনীতে, উভয়েই একপর্যায়ে বাংলাদেশের রাজনীতির অন্যতম কুশীলব হয়ে উঠেছিলেন এবং উভয়েরই মৃত্যু হয় অপঘাতে। ওপরতলে এই আপাত মিল থাকলেও ভেতরতলে এই দুজন ছিলেন সম্পূর্ণ ভিন্ন স্রোতের যাত্রী। তার পরও এই দুই বিপরীত স্রোত ইতিহাসের এক ক্রান্তিকালে এক বিন্দুতে এসে মিলেছিল এবং জন্ম দিয়েছিল এক ব্যাপক রাজনৈতিক ঝড়ের। যার পরিণতি এই দুজনের ব্যক্তিগত জীবনে এবং সেই সূত্রে গোটা জাতির ইতিহাসে হয়েছিল সুদূরপ্রসারী। তাহেরের জীবন এবং কর্মকাণ্ডের ওপর দীর্ঘদিনের গবেষণার ভিত্তিতে লেখা আমার ক্রাচের কর্নেল বইয়ে এ প্রসঙ্গের বিস্তারিত বিবরণ আছে। সংক্ষেপে এ বিষয়ে কিছু পর্যবেক্ষণের কথা উল্লেখ করব।

উল্লেখ্য, তাহের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নিয়েই সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়েছিলেন। তাহের ছিলেন মার্ক্সবাদে দীক্ষিত তরুণ, যিনি সেনাবাহিনী থেকে আহরিত জ্ঞান ব্যবহার করে সশস্ত্র সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের পরিকল্পনা করেছিলেন। সেই ভাবনার সূত্রে ১৯৬৯ সালে চট্টগ্রাম ক্যান্টনমেন্টে কর্মরত অবস্থায়, সে সময়ের বাম আন্দোলনের সশস্ত্র ধারার নেতৃত্বদানকারী সিরাজ শিকদারের সঙ্গে যুক্ত হয়ে মিয়ানমারের (বার্মা) কমিউনিস্ট পার্টির সহযোগিতায় অভ্যুত্থানের চেষ্টা তিনি করেছিলেন। সেই চেষ্টা সফল হয়নি এবং তাঁকে তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানে বদলি করা হয়। এরপর পাকিস্তান থেকে পালিয়ে এসে মুক্তিযুদ্ধের ১১ নম্বর সেক্টরের দায়িত্ব নিয়ে তাঁর সেক্টরের মুক্তিযোদ্ধাদের বিপ্লবী রাজনীতিতে উদ্বুদ্ধ করে যুদ্ধটিকে ভিয়েতনামের মতো দীর্ঘমেয়াদি জনযুদ্ধের দিকে নিতে চেয়েছিলেন। স্বাধীনতার পর কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্টের অধিনায়ক হিসেবে সেনাবাহিনীর ঔপনিবেশিক কাঠামো ভেঙে সেনাসদস্যদের গ্রামীণ কৃষি, স্বাস্থ্যবিষয়ক নানা রকম কর্মকাণ্ডে যুক্ত করে পিপলস আর্মির মডেল তৈরির চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু সেনাবাহিনীতে এর বিরূপ প্রতিক্রিয়া হয় এবং তাঁর ব্রিগেডকে ‘লাঙল ব্রিগেড’ বলে ঠাট্টা করা হয়। একপর্যায়ে ক্যান্টনমেন্টের অ্যাকটিভ কমান্ড থেকে তাঁকে সরিয়ে দেওয়া হলে তাহের স্বাধীনতার এক বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই সেনাবাহিনী থেকে পদত্যাগ করেন। সে সময় নানা ধারা-উপধারায় বিভক্ত বাংলাদেশের বাম আন্দোলনের প্রধান সব নেতার সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে বৈঠক করেন তাহের এবং অবশেষে তৎকালীন সরকারকে চ্যালেঞ্জ করে বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের ডাক দেওয়া নতুন কিন্তু শক্তিশালী দল জাসদে যোগ দেন। ঘটনাপরম্পরায় একপর্যায়ে তাহেরের নেতৃত্বে জাসদ এবং বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার পাটাতনে ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের অভ্যুত্থানটি সংঘটিত হয়। এই অভ্যুত্থান ব্যর্থ হলে তাহের বন্দী হন এবং তাঁকে অবৈধ বিচারের মাধ্যমে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। লক্ষণীয় যে, ধারাবাহিক রাজনৈতিক লক্ষ্য নিয়েই জীবনযাপন করেছেন তাহের।

পক্ষান্তরে জিয়া, বাবার চাকরি সূত্রে যাঁর জীবনের অধিকাংশ সময় মূলত কেটেছে তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানে, ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ মধ্যরাত পর্যন্ত পাকিস্তান সেনাবাহিনীর একজন নিষ্ঠাবান অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালন করে গেছেন। বিশেষ সন্ধিক্ষণে পক্ষ ত্যাগ করে তিনি মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন। তাহেরের নেতৃত্বে সংঘটিত ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের অভ্যুত্থানের পর তাহের জিয়াকে বন্দিদশা থেকে মুক্ত করলে ঘটনাচক্রে তিনি বাংলাদেশের রাজনৈতিক মঞ্চের একজন প্রধান কুশীলব হিসেবে আভির্ভূত হন। বলা বাহুল্য, পঁচাত্তরের ওই নাটকীয় ঘটনা পর্বের আগে সেনাবাহিনীর সাংগঠনিক কাঠামোর বাইরে জিয়ার জীবনে কোনো রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের নজির নেই। তবে সরাসরি রাজনীতিতে যুক্ত না থাকলেও মুক্তিযুদ্ধের সূচনালগ্ন থেকেই জিয়া নানাভাবে আলোচিত হয়ে ওঠেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় সেক্টর কমান্ডার হিসেবে কর্মরত আরও একাধিক বাঙালি সামরিক অফিসার থাকলেও জিয়ার নামটি বিশেষভাবে আলোচনায় আসে কাকতালীয়ভাবে যুদ্ধের সূচনালগ্নে বেতারে স্বাধীনতার ঘোষণা দেওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে। চট্টগ্রামে অবস্থিত স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্রের অন্যতম সংগঠক বেলাল মোহাম্মদ তাঁর ভাষ্যে জানিয়েছেন কী করে ঘোষণাটি পাঠ করানোর জন্য একজন সামরিক ব্যক্তিকে খুঁজতে গিয়ে ঘটনাচক্রে সেখানে অবস্থিত মেজর জিয়াকে তাঁরা পেয়ে যান। এরপর মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন জিয়াকে বেশ কয়েকটি বিতর্কে জড়িয়ে পড়তে দেখা যায়। তিনি মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সেনাপতি জেনারেল ওসমানীর নেতৃত্বকে চ্যালেঞ্জ করে ‘সামরিক পরিষদ’ গঠনের প্রস্তাব করলে ক্ষুব্ধ ওসমানী পদত্যাগের উদ্যোগ নেন, যা তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীনের মধ্যস্থতায় নিষ্পত্তি হয়। একপর্যায়ে নিয়মবহির্ভূতভাবে জিয়া নিজের নামে ‘জেড ফোর্স’ গঠন করলে মুক্তিযুদ্ধের আরেক সেক্টর কমান্ডার খালেদ মোশাররফের সঙ্গেও তাঁর দ্বন্দ্বের সূচনা হয়। পরে ‘কে ফোর্স’ এবং ‘এস ফোর্স’ গঠনের মাধ্যমে তার নিষ্পত্তি হয়। মইদুল হাসানের মূলধারা ’৭১ (১৯৯৪) এবং মুক্তিযুদ্ধের পূর্বাপর (২০০৯) বইয়ে মুক্তিযুদ্ধের সহ-অধিনায়ক এ কে খন্দকারের ভাষ্যে সে সময়ের অনুপুঙ্খ বিবরণ আছে।

এমন প্রেক্ষাপটে পাকিস্তান থেকে পালিয়ে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিয়ে ১১ নম্বর সেক্টরের দায়িত্ব নেন তাহের। ওসমানীর নেত্বত্বে যে প্রচলিত ধারার যুদ্ধকৌশলে মুক্তিযুদ্ধ চলছিল, সে ব্যাপারে আপত্তি ছিল তাহেরের। যুদ্ধে সনাতন-প্রক্রিয়ায় ব্রিগেড তৈরির বদলে গেরিলাযুদ্ধ এবং সাধারণ মানুষের ব্যাপক অংশগ্রহণের পক্ষে ছিলেন তাহের। বলা যায়, তাহের ও জিয়ার ভেতর পারস্পরিক যোগাযোগের প্রাথমিক ক্ষেত্রটি তৈরি হয় ওসমানী বিষয়ে দুজনেরই এই অসন্তুষ্টির পরিপ্রেক্ষিতে। সেনাবাহিনীতে জিয়া তাহেরের সিনিয়র। ওসমানী ও খালেদের সঙ্গে বৈরীর প্রেক্ষাপটে জিয়া তাহেরের প্রস্তাবকে সমর্থন করেন। তাঁর সমর্থনের সূত্র ধরে তাহের তেল ঢালায় জেড ফোর্সের হেডকোয়ার্টারে একাধিকবার জিয়ার সঙ্গে ব্যক্তিগত আলাপচারিতা করেন। তাহের এসব সাক্ষাতে মূলত সম্মুখযুদ্ধের তীব্রতা বাড়িয়ে, সেক্টর কমান্ডারদের হেডকোয়ার্টার বাংলাদেশের সীমান্তের ভেতরে স্থানান্তর করার ব্যাপারে জিয়াকে প্রস্তাব করেন। তবে জিয়ার এ ব্যাপারে বিশেষ আগ্রহ দেখা যায় না। তিনি বরং প্রচলিত ধারায় ব্রিগেড গঠনই অব্যাহত রাখেন। যুদ্ধের আদর্শিক প্রশ্নে নয়, সেক্টর কমান্ডারদের প্রভাব বলয়ের অভ্যন্তরীণ টানাপোড়েনের পরিপ্রেক্ষিতেই জিয়া তাহেরের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখতে আগ্রহী বলে প্রতীয়মান হয়। একপর্যায়ে তাহের নিজেই সম্মুখযুদ্ধে অবতীর্ণ হন এবং শেলের আঘাতে একটি পা হারান।

স্বাধীনতার পর তাহের ছিলেন সেনাবাহিনীর অ্যাডজ্যুটেন্ড জেনারেল আর জিয়া কুমিল্লা ব্রিগেডের কমান্ডার। জিয়ার ব্যক্তিগত অসন্তোষ ছিল সিনিয়র হওয়া সত্ত্বেও তাঁর বদলে সফিউল্লাহকে সেনাপ্রধান করায়। একপর্যায়ে জিয়াকে উপসেনাপ্রধান করে ঢাকায় বদলি করা হয় এবং কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্টের দায়িত্ব দেওয়া হয় তাহেরকে। তাহের জিয়ার কাছ থেকে দায়িত্ব বুঝে নেওয়ার প্রাক্কালে কিছুদিন একত্রে কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্টে কাটান। তাহেরের পারিবারিক সূত্র থেকে জানা যায়, দেশের সমসাময়িক রাজনৈতিক পরিস্থিতির নানা উদ্বিগ্নতা নিয়েই তখন কথা বলেছেন তাঁরা। তাহের সেনাবাহিনী থেকে পদত্যাগ করার সময় রাষ্ট্রপ্রধান শেখ মুজিবের উদ্দেশে লেখা চিঠিতে বাংলাদেশ ভয়াবহ বিপদের দিকে ধাবিত হচ্ছে বলে উল্লেখ করেন। পারিবারিক সূত্র থেকে জানা যায়, তাহের তাঁর পদত্যাগের সিদ্ধান্তের বিষয়টি ব্যক্তিগতভাবে জিয়ার সঙ্গে আলাপ করেছিলেন এবং পরবর্তীকালে তিনি যে রাজনীতিতে সক্রিয় হবেন, সে কথাও তাঁকে জানিয়েছিলেন।

সে সময় মুজিব সরকারের বিরুদ্ধে নানা রকম শক্তি ক্রিয়াশীল হতে শুরু করলেও মূলত দুটি শক্তি সংগঠিতভাবে এই বিরোধিতায় অগ্রসর হয়। একটি প্রকাশ্য, অন্যটি গোপন। প্রকাশ্যভাবে এবং রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে বিরোধিতা করে বাম রাজনীতিতে উদ্বুদ্ধ জাসদ, যারা সরকারবিরোধী গণ-অভ্যুত্থানের পরিকল্পনা করতে থাকে। সেনাবাহিনী থেকে পদত্যাগ করে এই জাসদেরই বেসামরিক সশস্ত্র শাখা গণবাহিনী এবং সামরিক বাহিনীর অভ্যন্তরীণ শাখা বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার নেতৃত্বের দায়িত্ব নেন তাহের। অন্যদিকে গোপনে এবং ষড়যন্ত্রমূলকভাবে সরকার উৎখাতের আর একটি পরিকল্পনা চলে অতি ডানপন্থী ধারার খোন্দকার মোশতাক, ফারুক, রশীদ প্রমুখের ভেতর। উপসেনাপ্রধান হিসেবে ঢাকায় স্থানান্তরিত হওয়ার পর দেখা যায় জিয়া সরকারবিরোধী প্রকাশ্য এবং গোপন সেই দুই শক্তির সঙ্গেই যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছেন। তাহেরের মাধ্যমে জিয়া পেতেন সে সময়ের সবচেয়ে শক্তিশালী বিরোধী রাজনৈতিক স্রোত জাসদের খবরাখবর। পক্ষান্তরে তিনি ফারুক ও রশীদের কাছ থেকে শুনেছেন মুজিববিরোধী গভীর ষড়যন্ত্রের খবরটিও। ফারুক, রশীদ প্রমুখ সরকার উৎখাতে তাঁদের সম্ভাব্য সহযোগী হিসেবে একজন অসন্তুষ্ট সেনা অফিসার জিয়াকে পাবেন তেমন প্রত্যাশা করতেন। অন্যদিকে আদর্শিক সঙ্গী না হলেও পারস্পরিক সুসম্পর্কের সূত্র ধরে সম্ভাব্য বিপ্লবী পরিস্থিতিতে সেনাবাহিনীতে শক্তি সংহত করতে জিয়ার কৌশলগত সহযোগিতার সম্ভাবনা দেখেছিলেন তাহের। বাংলাদেশের রাজনীতির অস্ট্রেলীয় গবেষক ডেনিস রাইট মন্তব্য করেছেন, ‘যখন ফলাফল অস্পষ্ট, তখন খানিকটা নিরাপদ দূরত্বে থেকে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত সব রকম পথ খোলা রাখা জিয়ার স্বভাবের একটি বৈশিষ্ট্য।’ (হাবীব জাফারুল্লাহ সম্পাদিত দি জিয়া এপিসোড ইন বাংলাদেশ পলিটিকস, সাউথ এশিয়ান পাবলিশার, ১৯৯৬) সম্পর্কের এই ত্রিমুখী বিপজ্জনক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের রাজনীতি এক নাটকীয় মোড় নেয়।

তাহের ও জিয়ার সম্পর্কের পরিণতি

বিশেষ সামরিক আদালতে কর্নেলতাহেরের মৃত্যুদণ্ডের রায় চ্যালেঞ্জ করে রিটের পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্টের পূর্ণাঙ্গ রায়ের পর ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের ঘটনাটি ফের আলোচনায় এসেছে। কথাসাহিত্যিক শাহাদুজ্জামানের লেখায় এই ঘটনার
প্রধান দুই কুশীলব আবু তাহের ও জিয়াউর রহমানের ভূমিকার ওপর আলো ফেলা হয়েছে।

সম্প্রতি তাহেরের ফাঁসিকে একটি হত্যাকাণ্ড এবং তাঁর পেছনে জেনারেল জিয়ার সংশ্লিষ্টতার ঘোষণা দিয়ে হাইকোর্টের রায়ের পরিপ্রেক্ষিতে গতকাল তাহের ও জিয়ার সম্পর্কের প্রেক্ষাপটটি বর্ণনা করেছি। আজ সেই সম্পর্কের পরিণতির ওপর আলোকপাত করতে চাই। আগেই উল্লেখ করেছি, স্বাধীনতা-উত্তরকালের মুজিব সরকারের প্রকাশ্যে বিরোধিতাকারী শক্তিশালী বামধারার রাজনৈতিক দল জাসদের নানা তৎপরতার ব্যাপারে জিয়া অবহিত হতেন তাহেরের মাধ্যমে, অন্যদিকে গোপনে মুজিব সরকারকে উৎখাতে মোশতাক চক্রের ডানপন্থী ধারার ষড়যন্ত্রের খবর তিনি পেতেন ফারুক, রশীদের মাধ্যমে। সরকারবিরোধী দুটি শক্তিই সম্ভাব্য রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে সেনাবাহিনীর কৌশলগত সহায়তা পেতে অসন্তুষ্ট উপসামরিক প্রধান জিয়াকে তাদের সম্ভাব্য মিত্র বলে বিবেচনা করেছিল। জিয়া দুটি তুরুপের তাসই নিজের হাতে রেখেছিলেন।

বাংলাদেশের রাজনীতির অস্ট্রেলীয় গবেষক ডেনিস রাইটকে উদ্ধৃত করে গতকাল লিখেছিলাম, যখন ফলাফল অস্পষ্ট, তখন খানিকটা নিরাপদ দূরত্বে থেকে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত সব রকম পথ খোলা রাখা জিয়ার স্বভাবের একটি বৈশিষ্ট্য। (হাবীব জাফারুল্লাহ সম্পাদিত দ্য জিয়া এপিসোড ইন বাংলাদেশ পলিটিকস, সাউথ এশিয়ান পাবলিশার, ১৯৯৬)। বলা বাহুল্য, ফলাফল স্পষ্ট হয় ১৯৭৫ সালের আগস্টে যখন মোশতাক চক্রের ডানপন্থী ষড়যন্ত্রমূলক শক্তিটি শেখ মুজিবকে হত্যার মাধ্যমে সরকার উৎখাতে সফল হয়। তুরুপের দুটি তাস হাতে রাখার সুফলও পান জিয়া। নতুন সরকারপ্রধান মোশতাক বিদ্যমান সেনাপ্রধান সফিউল্লাহকে সরিয়ে সেনাপ্রধান করেন জিয়াকে। বাংলাদেশের ইতিহাস এরপর এক গভীর নাটকীয়তার দিকে ধাবিত হয়। জুনিয়র অফিসারদের হাতে সংঘটিত এই রক্তাক্ত অভ্যুত্থান সেনাবাহিনীতে ব্যাপক বিশৃঙ্খলার জন্ম দেয়। সেই পরিপ্রেক্ষিতে সেনাবাহিনীতে চেইন অব কমান্ড ফিরিয়ে আনতে খালেদ মোশাররফ ২ নভেম্বর মাঝরাতে আরেকটি পাল্টা অভ্যুত্থান করেন এবং জিয়াকে গৃহবন্দী করেন। এই সময় আওয়ামী লীগের ব্যানার নিয়ে খালেদ মোশারফের ভাই ও মায়ের মিছিল, ভারতীয় রেডিও-টিভিতে খালেদের ক্ষমতা দখল নিয়ে উচ্ছ্বসিত সংবাদ ভুলভাবে এই অভ্যুত্থানের পেছনে ভারতীয় মদদ এবং আওয়ামী লীগের ভূমিকা রয়েছে বলে ধারণা তৈরি করে। আওয়ামী সরকারের পুনরুত্থানের সম্ভাবনাকে নস্যাৎ করতে মোশতাক চক্র গোপনে এ সময় জেলে আওয়ামী লীগের প্রধান চারজন নেতাকে হত্যা করে।

পরিস্থিতির জটিলতায় বন্দী জিয়া এ সময় নিজেকে পুরো দৃশ্যপট থেকে সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন এবং সেনাবাহিনী থেকে পদত্যাগ করে নিজের বেতন-ভাতা ইত্যাদির জন্য আবেদন করেন। কিন্তু জিয়া এও টের পান যে সেই রক্তাক্ত কাল পর্বে বন্দী অবস্থায় তাঁর জীবনও মোটেই নিরাপদ নয়। তাই শেষরক্ষা হিসেবে তিনি এ সময় তাঁর তুরুপের দ্বিতীয় তাসটি ব্যবহার করেন। তিনি টেলিফোনের মাধ্যমে গোপনে তাঁর জীবন বাঁচানোর জন্য অনুরোধ করেন তাহেরকে।

আগেই উল্লেখ করেছি, মুক্তিযুদ্ধের সময় সেক্টর কমান্ডারদের দ্বন্দ্বের প্রেক্ষাপটে তাহেরের সঙ্গে জিয়ার যে ব্যক্তিগত যোগাযোগ ঘটে, তা অব্যাহত ছিল স্বাধীনতার পরও। জিয়াকে যারা সেনাপ্রধান করেছে সেই মোশতাক চক্র সেই মুহূর্তে খালেদ মোশারফের অভ্যুত্থানের পরিপ্রেক্ষিতে অত্যন্ত নাজুক অবস্থায় নিজেদের জীবন রক্ষায় ব্যস্ত। ফলে তাদের কাছ থেকে সহায়তা পাওয়ার সম্ভাবনা নেই, জিয়া তা জানতেন। জিয়া এও জানতেন যে সে সময়ের বিরোধী রাজনীতির সবচেয়ে শক্তিশালী ধারা জাসদ এবং ক্যান্টনমেন্টের ভেতরের গোপন শক্তি বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার নেতৃত্বে আছেন তাহের। নিরবলম্ব জিয়া তাই টের পেয়েছিলেন, সেই মৃত্যুকূপ থেকে তাঁকে রক্ষা করার একমাত্র চাবিটি তখন রয়েছে তাহেরের হাতে। সেই ভরসাতেই তাহেরের কাছে জীবন বাঁচানোর আকুতি করেছিলেন তিনি। এবং বাস্তবিক বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার মাধ্যমেই ৭ নভেম্বরের অভ্যুত্থান ঘটিয়ে তাহের জিয়াকে মুক্ত করেছিলেন। কেন তাহের তা করলেন, সংক্ষেপে ইতিহাসের সেই মুহূর্তটিকে বুঝে নেওয়া যেতে পারে।

সে মুহূর্তে ক্যান্টনমেন্টে বিরাজ করছিল চরম উত্তেজনাকর পরিস্থিতি। কারণ, খালেদের অনুগত, ফারুক, রশীদের অনুগত এবং জিয়ার অনুগত সেনারা তখন পরস্পরের মুখোমুখি। এ রকম একটি পরিস্থিতিতে বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার সিপাহিরা জেনারেলদের ক্ষমতায় লড়াইয়ের গুটি হিসেবে আর ব্যবহূত হতে অস্বীকৃতি জানায়। তারা তাদের নেতা তাহেরকে অবিলম্বে একটি পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার তাগিদ দেয়, নইলে তারা নিজেরাই রুখে দাঁড়াবে বলে ঘোষণা করে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে ৫ নভেম্বর রাতে জাসদের নেতারা জরুরি বৈঠকে বসেন। জাসদের প্রধান নেতারাসহ হাজার হাজার কর্মী তখন জেলে। ফলে একটা অভ্যুত্থান ঘটিয়ে রাষ্ট্রক্ষমতা দখলে দ্বিধান্বিত ছিলেন তাঁরা। কিন্তু সেই আগ্নেয় পরিস্থিতি থেকে ফিরে যাওয়ার উপায় ছিল না। একটা ঐতিহাসিক চাপের মুখে তাঁরা তাঁদের বিপ্লব পরিকল্পনা ত্বরান্বিত করেন এবং জাসদের গণবাহিনীসহ বেসামরিক শক্তি ও বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার সামরিক শক্তির সমন্বয়ে ৭ নভেম্বর একটি অভ্যুত্থান ঘটানোর সিদ্ধান্ত নেন। সে সময় বাংলাদেশের রাজনীতি চালিত হচ্ছিল ক্যান্টনমেন্ট থেকে। অভ্যুত্থানের অংশ হিসেবে বন্দী জিয়াকে মুক্ত করে আপাতত ক্যান্টনমেন্টের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিজেদের সাংগঠনিকভাবে সংহত করার একটা অন্তর্বর্তীকালীন পরিকল্পনা করেন তাহের।

আগেই উল্লেখ করেছি, তাহের খুব ভালোভাবেই জানতেন যে জিয়া মোটেও তাঁদের আদর্শিক সঙ্গী নন। কিন্তু যে মানুষ বন্দী অবস্থায় আছেন, যিনি সেনাবাহিনী থেকে পদত্যাগ করেছেন, যিনি নিজের জীবন বাঁচানোর জন্য আবেদন জানিয়েছেন, তেমন একজন নাজুক ব্যক্তিকে মুক্ত করে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে সক্ষম হবেন বলেই ভেবেছিলেন তাহের। বিপ্লবী পরিস্থিতিতে বিপরীত মেরুর মানুষের সঙ্গে কৌশলগত আঁতাত তৈরির বহু নজির পৃথিবীতে আছে। একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ কিউবার বিপ্লব। কিউবার বাতিস্তা সরকারের পতন ঘটানোর পরও সেই বিপ্লবের কিংবদন্তি নেতা কাস্ত্রো বা চে গুয়েভারা কেউই সরাসরি রাষ্ট্রক্ষমতা নেননি। গেরিলা যুদ্ধক্ষেত্র থেকে সদ্য আসা কাস্ত্রো এবং চে নিজেদের গুছিয়ে নিতে অন্তর্বর্তীকালীন রাষ্ট্রপ্রধান করেছিলেন মধ্যপন্থী আইনজীবী মানুয়েল আরুটিয়াকে। সেই আরুটিয়া ক্ষমতা পেয়ে প্রতিবিপ্লবের চেষ্টা করেছিলেন কিন্তু কাস্ত্রো তাঁকে উৎখাত করতে সক্ষম হন।

কাস্ত্রো পারলেও তাহের তাঁর আপাতমিত্রের প্রতিবিপ্লবী তৎপরতাকে উৎখাত করতে পারেননি। লক্ষণীয়, ৭ নভেম্বরের অভ্যুত্থানের দুটি মাত্রা ছিল। একটি সামরিক, অন্যটি বেসামরিক। তাহেরের নেতৃত্বে সামরিক মাত্রাটি সফল হলেও, জনতাকে সংগঠিত করার বেসামরিক মাত্রাটি ব্যর্থ হয়, যার নেতৃত্বে ছিলেন সিরাজুল আলম খান প্রমুখ। ফলে অভ্যুত্থানের ভরকেন্দ্রটি জনতার ভেতর না এসে রয়ে যায় ক্যান্টনমেন্টে। কথা ছিল বন্দিদশা থেকে মুক্ত হয়ে জিয়া ক্যান্টনমেন্টের বাইরে এসে তাহেরের সঙ্গে যৌথভাবে পরবর্তী কর্মসূচি নিয়ে আলোচনায় বসবেন। কিন্তু জিয়া তাঁর জীবন রক্ষার জন্য তাহেরকে ধন্যবাদ জানালেও প্রতিশ্রুত সাক্ষাতের জন্য ক্যান্টনমেন্টের বাইরে আসেননি বরং অন্যান্য সেনা কর্মকর্তার সঙ্গে যোগসাজশ করে অতিদ্রুত পুরো পরিস্থিতি নিজের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেন। এই বিশৃঙ্খল পরিস্থিতিতে খালেদ মোশাররফসহ আরও কয়েকজন সেনাকর্তা সৈনিকদের হাতে নিহত হন। বন্দিদশা থেকে মুক্ত হয়ে দ্বিতীয় জীবন পেয়ে জিয়া দ্রুত সক্রিয় হয়ে ওঠেন এবং ক্যান্টনমেন্টে নিজের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হন। ক্ষমতা নিজের নিয়ন্ত্রণে এনে ৭ নভেম্বরের অভ্যুত্থানের সঙ্গে যুক্ত সবাইকে তিনি একে একে গ্রেপ্তার করেন। গ্রেপ্তার হন তাহেরও এবং একপর্যায়ে গোপন সেই অবৈধ বিচারের মাধ্যমে তাঁর মৃত্যুদণ্ডের ব্যবস্থা করেন। তাহের বিচারের সময় তাঁর জবানবন্দিতে জিয়াকে বিশ্বাসঘাতক মীরজাফরের সঙ্গে তুলনা করেছিলেন।

তাহের ও জিয়ার সম্পর্কের এই পরিণতিকে আমাদের বুঝতে হবে সে সময়ের বিশ্বরাজনীতির প্রেক্ষাপটে। তখন পুঁজিবাদী ও সমাজতান্ত্রিক বিশ্বের জোর ঠান্ডা লড়াইয়ের কাল। ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের অভ্যুত্থানের মাধ্যমে এ দেশে প্রথমবারের মতো একটি সমাজতান্ত্রিক ধারার শক্তি রাষ্ট্রক্ষমতার অত্যন্ত নিকটবর্তী হয়েছিল, যার নেতৃত্বে ছিলেন তাহের। দেশের ভেতর ক্রিয়াশীল মার্কিনপন্থী, পাকিস্তানপন্থী, ধর্মীয় মৌলবাদী, মুক্তিযুদ্ধবিরোধী যাবতীয় সামরিক, বেসামরিক শক্তির প্রয়োজন ছিল যেকোনো মূল্যে এই সমাজতান্ত্রিক স্রোতটিকে ঠেকানো। তারা সামনে পেয়েছিল অনিশ্চিত সাঁতারু কিন্তু ক্ষমতায় আগ্রহী জিয়াকে। এই পুরো শক্তিটি তাই জিয়ার পেছনে গিয়ে দাঁড়িয়েছিল। প্রতিবিপ্লবী এই শক্তি বিপ্লবী শক্তির মূলকেন্দ্র তাহেরকে হত্যা করে তাই সমাজতন্ত্রের ধারাটিকে সমূলে নিশ্চিহ্ন করতে চেয়েছিল। জিয়া কর্তৃক তাহেরের ফাঁসির এই আয়োজনকে তাই নেহাত ব্যক্তিগত আক্রোশের বিষয় ভাবার কারণ নেই। এটি দুটি বিপরীতমুখী আদর্শ ও শক্তির সংঘাতের অনিবার্য পরিণতি। জিয়া ও তাহের ছিলেন দুটি ভিন্ন শক্তির প্রতিভূ, যাঁরা পরস্পরকে কৌশলগতভাবে ব্যবহার করার চেষ্টা করেছিলেন। ইতিহাসের বিশেষ মুহূর্তের ভুলভ্রান্তির মিথস্ক্রিয়ায় পরাজয় ঘটেছিল তাহেরের, জয়ী হয়েছিলেন জিয়া। ফলে স্বভাবতই আমরা তাহেরের প্রত্যাশিত মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় লালিত সমাজতান্ত্রিক ধারার কোনো বাংলাদেশকে পাইনি বরং জিয়ার হাত ধরে পরবর্তীকালে এখানে বিকশিত হতে দেখেছি মুক্তিযুদ্ধবিরোধীদের, ধর্মীয় মৌলবাদীদের এবং মুক্তবাজারের লুটেরা পুঁজির ধারকদের। কিন্তু ইতিহাসের গতি পাল্টায়, তাহের নিশ্চিহ্ন হননি, ফিরে এসেছেন। এখন দেখার বিষয় তাহেরের আদর্শটি ফিরে আসে কি না।

সর্বশেষ খবর ও ইভেন্ট

There are no upcoming events.

আরও খবর ও ইভেন্ট